শোকাবহ আগস্ট


আগস্ট এলেই মোচড় দিয়ে ওঠে বাঙালির বুকের ভেতরটা। স্মৃতির উঠানে গল্প বলে বেদনার। বাঙালির অমোঘ নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণে-শ্রদ্ধায়, কান্নায়, ভালোবাসায় বারবার অবনত হয় মাথা। কতগুলো বর্বর সেনা কর্মকর্তা, বর্বরোচিত অভিলাষ পূরণে, গড়ল যে ঘৃণ্য ইতিহাস-তার মর্মবেদনা বাঙালিকে বয়ে বেড়াতে হবে অনন্তকাল। ঘৃন্য সে কালিমায় লিপ্ত হলো সহজ সরল বাঙালির মুখ।

ঘাতকরা চেয়েছিল বাঙালির মন থেকে চিরতরে মুছে দিতে, তাদেরই ঘরের মানুষ, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ। তাই হত্যার পর ধানমন্ডির বাড়িটিও বন্ধ করে দেয় তৎকালীন সরকার। নিষিদ্ধ হয় যে কারো প্রবেশ। পড়ে থাকে অযত্নে, অবহেলায়। কেবল রাতের আঁধারে, ভেতরে গুমরে কাঁদে এক বেদনার ইতিহাস। অবিরত কাঁদতে থাকে শোকে ক্ষয়ে আসা ন্যুব্জ বাড়িটি।

দেশের বাইরে থাকায় ভয়াল সে রাতের মর্মন্তুদ হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে রক্ষা পান দুই কন্যা—শেখ রেহানা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ’৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। তখনো বাড়িটি সিল করে রেখেছিল জিয়াউর রহমান সরকার। বাড়িতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না তাকে। কিন্তু অন্যায্য সে নিষেধাজ্ঞাই বা কত দিন সম্ভব! তাই বাধ্য হয়ে সে বছরের ১২ জুন তৎকালীন আবদুুস সাত্তার সরকার বেঁচে থাকা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে বাড়িটি।

একদিন বুকে নিয়ে সমুদ্রসম বেদনা, সে বাড়িতে প্রবেশ করলেন জাতির জনকের অসহায় স্বজনরা। তখনো বাড়িময় খুন হওয়া স্বজনের ছোপ ছোপ রক্ত। পাওয়া গেল বাঙালির মুক্তির মূলমন্ত্রক ও জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের লেখা স্মৃতিকথা, ডায়েরি ও চীন ভ্রমণের খাতা। ঘরের এক কোনে উঁইপোকায় খাওয়া কিছু টাইপ করা কাগজ। আরো কত কি!

বস্তুত, ১৯৭৫ সালের পনেরই আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে এক বিপরীত ধারায় যাত্রা শুরু করে দেশটি। বেসামরিক সরকার উৎখাত হয়ে সেই প্রথম রচিত হয় সামরিক শাসনের অনাচারি ইতিহাস। এ ব্যাপারে লেখক ও গবেষক ড. হাসানুজ্জামান তার ‘১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থান মুজিব হত্যা ও ধারাবাহিকতা’ শীর্ষক গ্রন্থে বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কেবল শেখ মুজিবের হত্যাকান্ডই ঘটেনি, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারেরই ক্ষমতাচ্যুতি হয়নি, ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকে অবৈধ বলে প্রতিরোধ করা হলে এর পর একের পর এক দুই ডজনেরও অধিক অভ্যুত্থান প্রক্রিয়া ঘটত না। একের পর এক এত হত্যাকান্ড হতো না। ১৫ বছর দেশ সামরিক শাসনের কব্জায় থাকত না।’

বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র কয়েক দিন পর ২৮ আগস্ট ‘দ্য গার্ডিয়ান’ লিখে ১৫ আগস্টের ঘটনার ভেতর দিয়ে যেন বাংলাদেশের জনগণ আইয়ুবের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় প্রচারণা এবং সামরিক শাসনের কালে প্রত্যাবর্তন করেছে। ১৯৮২ সালের ৫ এপ্রিল টাইম ম্যাগাজিনেও বলা হয়, ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থান ও শেখ মুজিবের হত্যার পর গণতান্ত্রিক আমলের অবসান হয়।

Facebook Comments