ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা


এ সময় ঢাকার অন্যান্য যে সব ছাত্রী নেতৃত্ব ভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করতেন তাদের মধ্যে কামরুন নেছা, সুফিয়া খান, খুলনার সুফিয়া আলী, বেবী, সুরাইয়া হাকিম, সুরাইয়া ডলি, রওশন আরা বাচ্চু, খুলনার নাদেরা বেগম ও রোকেয়া। সারারাত জেগে পোস্টার লেখার দায়িত্ব পালন করতেন নূরুন্নাহার কবির। রওশন আরা বাচ্চুর সহযোগী ছিলেন কাজী খালেদা পুতুল ও আমেনা বেগম।

এ আন্দোলনে সরাসরি যারা জড়িত ছিলেন তারা হলেন_ সাফিয়া খাতুন, হালিমা খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, সুফিয়া ইবরাহিম, বোরখা শামসুন প্রভৃতি।

৬ ফেব্রুয়ারি মোগলটুলিতে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় একুশের প্রস্তুতি ও অর্থ সংগ্রহের জন্য ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘পতাকা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফেব্রুয়ারির দুই সপ্তাহ ধরে ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্তুতি চলে।

এদিকে ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এক মাসের জন্য সভা শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
১৪৪ ধারা জারির পরিপ্রেক্ষিতে ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর ৯৪ নওয়াবপুর রোডে আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের বৈঠক বসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন আবুল হাশিম। সভায় ১৪৪ ধারা না ভাঙার প্রস্তাব আনা হয়। প্রস্তাবের ওপর ভোট গ্রহণ করা হলে অলি আহাদ, শামসুল আলম, আব্দুল মতিন, গোলাম মাওলা প্রস্তাবের বিপক্ষে অর্থাৎ ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ভোট দেন। মোহাম্মদ তোয়াহা ভোটদানে বিরত থাকেন। ১৪৪ ধারা না ভাঙার প্রস্তাব পাস হয়। ৪/১২ ভোটে অর্থাৎ ভাঙার পক্ষে ৪ জন বিপক্ষে ১১ জন।

ক্যাম্পাসে (ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়) রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গভীর রাত পর্যন্ত মিটিং করে। তারা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে যায়, ঐক্যের স্বার্থে পরের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলায় ছাত্র সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার প্রস্তাব পাস হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় ঐতিহাসিক ছাত্রসভা শুরু হয়। সভাপতি গাজীউল হক। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভায় প্রথম বক্তব্য রাখেন শামসুল হক তিনি ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে। ভাঙার পক্ষে জোরাল বক্তব্য রাখেন আব্দুল মতিন ও সভার সভাপতি গাজীউল হক। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে।
১০ জনের একেকটি দল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে বের হয়ে শান্তিপূর্ণ সেস্নাগানসহ পরিষদ ভবনের দিকে এগিয়ে যাবেন। এভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় দল বের হলে গেটে ব্যারিকেড দেয়া পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে কৌশলগত কারণে পরবর্তী দল ছাত্রীদের নেতৃত্বে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
ছাত্রী দলের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের তৎকালীন জিএস ড. শাফিয়া খাতুন। তার সঙ্গে ছিলেন ড. সুফিয়া আহমেদ, অধ্যাপিকা শামসুন নাহার আহসান, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, মাহফিল আরা খোরশেদী খানম, সুরাইয়া, ড. হালিমা প্রমুখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নেতারা।

মিছিলে অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যে ছাত্রীরা এসেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন কাজী খালেদা, সাজু, পুতুল, মনোয়ারা, আমেনা বেগমসহ আরো অনেকে। তাদের মধ্যে কয়েকজন স্কুলছাত্রীও ছিল। ছাত্রীদের সাথে একজন শিক্ষিকাও ছিলেন। তিনি হলেন মমতাজ বেগম। নারায়ণগঞ্জ মর্গান হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। তিনি গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান এবং বন্ড দিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি লাভে অস্বীকৃতি জানালে তার স্বামী তাকে তালাক দেয়। মমতাজ বেগমের সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। দুপুর ২টা পর্যন্ত ছাত্রদের মিছিলের সাথে ছাত্রীরাও অংশগ্রহণ করে এবং বীরত্বের সাথে গ্রেপ্তার বরণ করে।

ভাষা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন ছাত্রী নেত্রীর পরিচয়-
ড. হালিমা খাতুন :ড. হালিমা খাতুন ১৯৩৩ সালের ৮ আগস্ট বাগেরহাট জেলার বাদেকাড়া পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী আ. রহিম শেখ। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে মহিলা নেত্রী ও সংগঠক হিসেবে সভা সমিতি আয়োজন, সংগঠন, শোভাযাত্রা, বক্তৃতা বিবৃতি, প্রচারপত্র বিলি ইত্যাদি বিষয়ে নিরলস কাজ করেছেন। ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্রীদের নিয়ে আমতলায় যান। প্রথম ১০ জনের ভাষাসৈনিকের নেতৃত্বে তিনিও ছিলেন।

ড. শাফিয়া খাতুন

ড. শাফিয়া খাতুন: ১৯৩১ সালের ১৫ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মীর আসগর আলী। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে ছাত্রী সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং ‘৫২ সালে ভিপি ছিলেন। ১৪৪ ধারা ভাঙায় তার ভূমিকা মুখ্য ছিল। ‘৫২ সালে শুভেচ্ছা সফরে তুরস্কে যান।

মিসেস উষা বেপারী : ১৯২৯ সালে রাজবাড়ী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ‘৫২ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সিংয়ের ছাত্রী ছিলেন। আহত ভাষা সৈনিকদের সেবা ও পুলিশের কাছে তাদের নাম ঠিকানা গোপন রাখেন ও গ্রেপ্তার এড়ানোতে সাহায্য করেন।

সুফিয়া করিম: ১৯৩০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম বদিউজ্জামান। ‘৫১-৫২ সালে ইডেন গার্লস কলেজের ছাত্রী সংসদের জিএস ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করার জন্য স্কুল-কলেজ ও মহল্লায় পিকেটিং করেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অন্যতম নেত্রী ছিলেন।

ডা. জোহরা বেগম কাজী

ডা. জোহরা বেগম কাজী: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এ দেশের নারীদের অবদান অনেক। তাদেরই একজন ডা. জোহরা কাজী। শুধু পেশাগত দায়িত্ববোধ নয়, বাংলা ভাষা ও বাঙালির প্রতি অসামান্য মমত্ববোধ থেকে ভাষা আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় ব্রতী হয়েছিলেন তিনি। বাংলার বাইরে ভারতের মধ্য প্রদেশে জন্ম ও প্রতিপালিত হলেও মাদারীপুরের এই ক্ষণজন্মা নারী ছিলেন মনেপ্রাণে বাঙালি।

উপরে বর্ণিত ছাত্রীরা তদানীন্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং ইডেন গার্লস কলেজের শিক্ষয়িত্রী ও ছাত্রীরা ২১ ফেব্রুয়ারি ও পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও ২১ ফেব্রুয়ারির পরে দেশব্যাপী যে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে তাতে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলার ছাত্রী মহিলারা অংশগ্রহণ করেন।
১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ পালনের চেষ্টা করা হয়। পুলিশের দাপটে ছাত্র ফেডারেশন তা পালনে ব্যর্থ হয়। এ সময় বিক্ষোভ মিছিলে ছিল তকিউল্লাহ, নাসির আহমদ এবং নাদিরা বেগম।

এ সময় ঢাকার অন্যান্য যে সব ছাত্রী নেতৃত্ব ভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করতেন তাদের মধ্যে কামরুন নেছা, সুফিয়া খান, খুলনার সুফিয়া আলী, বেবী, সুরাইয়া হাকিম, সুরাইয়া ডলি, রওশন আরা বাচ্চু, খুলনার নাদেরা বেগম ও রোকেয়া। সারারাত জেগে পোস্টার লেখার দায়িত্ব পালন করতেন নূরুন্নাহার কবির। রওশন আরা বাচ্চুর সহযোগী ছিলেন কাজী খালেদা পুতুল ও আমেনা বেগম।
এ আন্দোলনে সরাসরি যারা জড়িত ছিলেন তারা হলেন_ সাফিয়া খাতুন, হালিমা খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, সুফিয়া ইবরাহিম, বোরখা শামসুন প্রভৃতি।

ঢাকার বাইরে যারা আন্দোলনে অংশ নেন_ তাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের মর্গান হাইস্কুলের মমতাজ বেগম ভাষা আন্দোলনে কারাবন্দি হন। বন্ড দিয়ে কারামুক্তির শর্ত পালন না করায় তার স্বামী তাকে তালাক দেন। ভেঙে গেল মমতাজ বেগমের সোনার সংসার। নারায়ণগঞ্জের আরো যারা কারাবন্দি হন তাদের মধ্যে ছিলেন বেনুধর ও ইলা বকশী। সিলেটের কুলাউড়ার সালেহা বেগম ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। কালো পতাকা উত্তোলনের অপরাধে সেখানকার ডিসি ডিকে পাওয়ার তাকে ৩ বছরের জন্য রাস্ট টিকিট (বহিষ্কার আদেশ) করেন। জীবনে তার আর পড়াশোনা হয়নি। খুলনার স্কুলছাত্রী হামিদা খাতুন মহিলাদের ঐক্যবদ্ধ করার অপরাধে লাঞ্ছিত হন। খুলনার আরো যারা আন্দোলনে সহযোগিতা করেন তাদের মধ্যে সাজেদা আলী, বেগম রোকেয়া, মাহবুব শিরি, কৃষ্ণ দাস এবং সহেলী নাদিরার নাম উল্লেখযোগ্য। যশোরে ভাষা আন্দোলনের জোরালো নেতৃত্বে ছিলেন হামিদা রহমান। সিলেটে ভাষা আন্দোলনের নেত্রীর নাম যোবেদা খাতুন চৌধুরী। তার সহযোগিতায় ছিলেন-শাহেরা বানু, সৈয়দা লুৎফুন্নেছা খাতুন এবং শিক্ষয়িত্রী রাবেয়া খাতুন।

একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশন মুলতবির দাবিতে বিরোধীদলীয় নেতা মওলানা আব্দুর রশিদ তর্ক বাগীশের সাথে একমাত্র বিরোধীদলীয় মহিলা সংসদ সদস্য আনোয়ারা বেগম অধিবেশন থেকে বেরিয়ে আসেন।

Facebook Comments