দেশহীন এক সদ্যজাত কন্যার গল্প


দীপু মাহমুদ: নাফ নদীতে বাতাস উঠেছে। এলোমেলো ঠান্ডা বাতাস। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। নৌকা দুলছে। নৌকা দুলছে প্রবলভাবে। ফাতেমা কাতর গলায় কঁকিয়ে উঠল, `আল্লাহ গো।`
আজিজ বলল, `আর একটু বৌ। আর একটু। ওই তীর দেখা যাচ্ছে। একটু সহ্য কর।`
ফাতেমা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার চেষ্টা করছে। সহ্য করতে পারছে না। গর্ভের সন্তান বের হয়ে আসতে চাইছে। ফাতেমার তলপেটে অসহ্য ব্যথা। 
টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ওপাশে গুলির শব্দ। নৌকা যাচ্ছে এঁকেবেঁকে। নদীর দুইপাশে দুইদেশের সীমান্তরক্ষী। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে যেতে হচ্ছে। নাফ নদী যেন আচমকা বড়ো হয়ে গেছে। অনেক বড়ো। বেসামাল ঢেউ উঠেছে নদীতে।
পাড়ে নৌকা ভিড়তেই ফাতেমাকে কোলে তুলে নিল আজিজ। বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। শুকনো জায়গা দরকার। মাথার ওপর ছাউনি। ফাতেমা মা হবে।
সীমান্তরক্ষীর নজর এড়ানো গেল না। আজিজ আর ফাতেমাকে ফিরে আসতে হলো। নো ম্যানস ল্যান্ডে বসে পড়ল আজিজ। তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে মাঠের ভেতর শুয়ে পড়েছে ফাতেমা। খাঁ খাঁ মাঠ। ওপাশে নদী। নদীর ওপারে তাদের বাড়ি। এপারে অন্য এক দেশ। নিজের দেশে মা হতে পারেনি ফাতেমা। বুটের ভয়ংকর আওয়াজ আর গুলির শব্দে জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছে। অন্য এক দেশে মা হতে চেয়েছিল। এখানে সীমান্ত। তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
অমনি ফাতেমা ভয়ানক চিৎকারে মাটি খামচে ধরল। মেয়েরা ঘিরে বসেছে তাকে। ফাতেমার নিশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে। প্রশান্ত বোধ করছে এখন। ফাতেমা মা হয়েছে।
মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। খুব ক্ষীণ কণ্ঠে সন্তানের কান্নার আওয়াজ শুনে চমকে উঠেছে আজিজ। হতভম্ব চোখে কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে আজিজ বিড়বিড় করে বলল, `নো ম্যানস ল্যান্ডে জন্ম নিয়েছিস। মা, তোর দেশ কোনটা? দেশহীন মানুষ তুই। অবাক জন্ম তোর এই পৃথিবীতে।`
আজিজ কাঁদছে। তার অসহায় চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ঝুম বৃষ্টিতে আজিজের চোখের পানি আলাদা করা যাচ্ছে না। উথালপাতাল বৃষ্টির ভেতর ফাতেমার শাড়ির নিচে সদ্যজাত এক শিশু হাত-পা ছুঁড়ছে। সে বাঁচবে।

Facebook Comments