তুমি…


|| হাসানুর রহমান শাহীন ।।

স্বপ্নহীন রূপকথা,
-হাতটা একটু ধরবে??
ক্ষুদ্র আকুতির এই অল্প ইচ্ছার কথাটা হয়তো বলা হয় না তোমাকে। কিংবা সন্ধ্যার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলা হয় নাঃ
ভালোবাসি।
চারটা ছোট্ট অক্ষর,
চার দেয়ালের ঘর,
জানালার আয়তাকার ফ্রেমে,
কিংবা,
মুঠোফোনের এই ছোট্ট স্ক্রীনে আমি জমিয়েছিলাম কত ভালোবাসা,
দেইনি তোমায় জানতে।
কল্পনার আকাশে রঙধনুকে বলেছিলাম তোমার প্রিয় রঙে বদলে যেতে, আজ সাদা কালো আকাশ, ধুসর স্বপ্নজাল এখানে ওখানে ছিঁড়ে গেছে আর মেঘগুলো কবেই ক্লান্ত ছুটাছুটি করতে আমার নির্বোধ ভেতরের সময় ঘড়ির হৃদপিন্ডটার মতই ক্লান্ত।
অথচ এই আকাশে পাঠিয়ে দেয়ার কথা ছিলো তোমার কাছে,
এক বরষায় ঘরে কেবল মোমবাতির আলোয় ভরিয়ে দিয়ে কান পেতে শোনার কথা ছিলো বৃষ্টির শব্দ।
কিংবা এক জোছনায় আমার ঘরের দুয়ারে আসার কথা ছিলো। আচ্ছা যদি মৃত্যর আগে আমার শেষ ইচ্ছা হয় তোমার হাতটা ধরার,
তুমি আসবে কি?
কি বোকা প্রশ্ন!!
তাই না?
সময়ে সময়ে মানুষ একা হয়ে যায়।
আমার সেই একা থাকার গল্পে,তুমি কেবল উর্বর মস্তিষ্কবিকৃত এক রোগ।
ভয়ংকর হেলুসিনেশান।
কেবল আমার কল্পনা।
কল্পনায় তোমায় ছোয়া যায়,আমি তাই কল্পনায় ডুবে রই, পরীক্ষার হলের গোল বৃত্তগুলো তাই অর্থহীন লাগে, হাস্যকর লাগে নিজের কাজগুলোকে।
জানো,
মিস মি?
এই কথাটাও তোমাকে বলা হয়নি।
কি আশ্চর্য!
আমি ভীতু নাকি?
কিন্তু মেসেজটা টাইপ করে পাঠাবো বলো তো??
ওহ! তুমি তো কিছু বলবে না।
কারন,
তুমিই আমি, আমিই তুমি।
তোমার অস্তিত্ব নেই,
আমার আছে কি?
সময় কিছুই ঠিক করে নি।
ঠিক হয়নি আমার ডিপ্রেশন, হয়নি কিছুই।
তবে দেখ সব ছেড়ে ছুড়ে ঘরে বন্দী হয়ে গেছি।
আমার কাছে আমি অসুস্থ, আমি জানি আমার অসুখ কোথায় বেধেছে।
তুমি নেই, তাই তুমি বলে যদি কেউ এসে এক পৃথিবী ভালোবাসাও দেয়,তবু আমি সুস্থ হবো না।
আমার রোগ তুমি নও,
তোমার শূন্যতা।
আমার কিছু না পেতেই ভালো লাগে,কেউ ভালোবাসলে সে ভালোবাসা খুন করতে ভালো লাগে,
লেইম কাজ করতে ভালো লাগে,
কারো চোখে থার্ড ক্লাস হতে ভালো লাগে,
জানো?
যখন কেউ ইনবক্সে এসে গালি দেয় আমি চুপ করে থাকি।
সবাইকে একটা হাসি আর একবার, বারবার হুম বলা ছাড়া বলার মত শব্দ নেই।
তুমি ঘুম হয়ে রয়ে যাও চোখে, নামো ভয়ংকর স্বপ্ন হয়ে, নির্ঘুম রাত কাটে তুমিহীন পৃথিবীতে শূন্যতার শূন্য গল্প শুনে।
তোমার চোখে প্রতিদিন হাজারবার মরে যেতে ইচ্ছে করতে গিয়েই আবিষ্কার করতাম আমার চোখের কোনে বাতাস লাগছে, আর গাল গড়িয়ে টুপ করে ঝরে পড়েছে জল।
নাহ! আমি কাদি নি!
আশ্চর্য আমি কাদবো কেন?
লোকে হাসবে না?
রোদে গেলে আমার চোখের পাতা কাপে,আমি তাই কোথাও যাই না।সামনে দাঁড়াই না কারো।
আমার একটা কাধ দরকার ছিলো চোখের জল মুছে দেয়ার জন্য, কিংবা প্রচন্ড রোদে ঘামার পর কারো আচল, কিংবা আইসক্রিম খাওয়ার পর টিস্যুরর অভাব পূরনের জন্য তোমায়,
কি আশ্চর্য!!
তুমি যে কেবল মায়ায় আকা মনের ফ্রেমে নিরাকার এক ছবি,
যার অস্তিত্ব নেই।
হয়তো পাশে থাকলে বলতেঃ
এত নাটক কেন? you are a liar! you don’t love, just pretend to do so!! you are the 3rd class!!
-এই কথার সাথে অশ্রাব্য হাজার গালি দিলেও চুপ করে শুনতাম।
এই যে মশা দেখছো আমার ডান হাতের কব্জির ওপর। মাসখানেক আগে আমায় কামড়ে দিয়েছিলোঃ
ডেঙ্গু বেধেছিলো আমার শরীরে।
আমি জ্বরের ধাক্কা সামলে উঠতে পারছিলাম না।
ঠিক সেদিন বুঝলামঃস্বপ্নহীন রূপকথা কেবল আমার কল্পনা!!
একটা সপ্তাহ আমার ঘোরে কেটেছে।
আমি ভেবেছিলাম তোমার হাতটা ধরবো।
কিন্তু তুমি কেবল কল্পনা।
আমি তাই চুপ করে থাকি।

এইখানে ওইখানে হাটি।
তুমি আষাঢ়ে গল্পের মত মিথ্যে আর আমি আষাঢ়ে সে গল্পকে ভেবেছিলাম রবীঠাকুরের বর্ষার দিনে কবিতার লাইনের মত প্রানবন্ত কিংবা রোদভরা দিনের শেষে বনলতা সেন কবিতার শেষ ছয় লাইন।
কিন্তু বেলা শেষে লাইন গুলো নয় ছয় হয়ে হয়ে যায়। আমি হিসাব মেলাতে পারি না।
তখন সবচেয়ে সহজ উপায়ে সমাধান করে ফেলি জীবনের সমীকরন।
সব স্বপ্নময়ী কল্পনার পাশে গুন করে দেই একটা ছোট শূন্য।
আর তখনি গল্পটা মিলে যায়।
কিছু চাইবার থাকে না কিংবা বলবার।
থাকে না অপেক্ষা।
থাকো না তুমি।
থাকে কেবল তুমিহীনতা।
আমি ছুটি নিয়েছি।
একা মানুষেরা তাই তোমাকে নিয়ে বাঁচে।
তোমার না থাকা নিয়ে বাঁচে।
কারন
তুমি বলে যে কেউ নেই।
চায়ের কাপের ভেতরে থাকা চায়ের উষ্মতাহীন তেতো ভাবটা আসে তুমিহীনতায়।
আমার সকাল হয় না,
রাত আসে না।
ক্যালেন্ডারে বদলায় না দিন।
আমার কাছে রাতের প্রতি সেকেন্ডের শব্দটাকে এক যুগের তুমিহীনতা!!

অনেকদিন পর বাইরের বাতাস খেলাম।মনে হচ্ছে যেন অনেক অনেক বছর পর।ইরা কে একটু কল করতে হবে।জানিনা কেমন আছে কোন অবস্থায় আছে
-হ্যালো
~আসসালামু আলাইকুম
-ইরা??
~কে বলছেন??
-ইরা আমি হাসান
~হাসান ভাইয়ায়ায়ায়ায়ায়া
আপনি এতদিন পর???
আপনি এতদিন কই ছিলেন??
-ছিলাম একজায়গায়।ইরা কে দাও ওর সাথে কথা বলব
~বিকালে একটু আমার সাথে দেখা করবেন??
-আজব তো আমি কেন তোমার সাথে দেখা করব??আর ইরা কই??দিচ্ছ না কেন ওকে??
~ভাইয়া শুধু ১০মিনিট দেখা করবেন প্লীজ
-আচ্ছা।ইরা কে দিবে এইবার??
~বিকালেই দেখা কইরেন
-তাহলে এতক্ষণ শুধু শুধু ঢং করলা কেন
বলেই ঘটাং করে ফোনটা রেখে দিলাম
অনেক কাজ বাকী।ইরা কে বিয়ে করেছিলাম দেড় বছর আগে।কিন্তু ওকে বাসায় নিতে পারি নি।কারন আম্মু রাজী ছিল না।আজ নিব।অনেক শপিং করব
আহ!!!! না জানি আমার ইরা কেমন হয়েছে।ইরা টা অনেক চিকন ছিল।খেতে বলতাম তবুও খেত না।বেশি ঘুমাতে মানা করতাম তবুও ঘুমাত।এক কথায় যা বলতাম তাই অমান্য করত।তবুও ভালবাসতাম।অনেক বেশি ভালবাসতাম।
প্রতিদিন সকাল বেলা ওকে ডেকে দিতে হত।না ডাকলে কয়েকঘন্টা কথাই বলত না আমার সাথে।খুব অভিমানী ছিল।
আচ্ছা ইরা কি এখনও সেই আগের মতই অভিমানী আছে নাকি পাল্টে গেছে?
ওকে যেদিন বিয়ে করলাম সেইদিন কত কাহিনী।
সকাল থেকেই বৃষ্টি।তার ওপর ওর বাসায় মেহমান।এত মানুষকে ফাকি দিয়ে আমার ইরা আমার কাছে এসেছিল।
বিকেলে দেখা হবে ইরার সাথে।আমার ইরার সাথে।আমার বউর সাথে।অপেক্ষায় আছি
অবশেষে বিকেল আসল।আর হাসান আসল তার ইরার সাথে দেখা করার জন্য
-ইরিন তুমি কি বলবা জলদি বল আর ইরা কই?? আসল না যে এখনো??
~হাসান ভাইয়া
-হুমম বল
~আপনি এতদিন কই ছিলেন?
-ছিলাম একজায়গায়।ইরা কে ডাকো।সব বলব ওকে
~আপুনি আসবে না।অভিমান করেছে আপনার ওপর
-একটা বার শুধু ডেকে আনো।আমি সব বুঝিয়ে বলব ওকে
~উহু আসবে না।আর কখনই আসবে না
-ডাকো না ওকে প্লীজ
~আপনি বলুন আপনি এতদিন কই ছিলেন?? আমার বোনকে ফেলে কই গিয়েছিলেন?? একটা বার ও মনেহয় নি ও কই যাবে কার কাছে যাবে??
-ইরা কে ডাকো একটা বার
~ইরা আপুনি আর নেই হাসান ভাইয়া।মারা গেছে ১বছর আগে
-মানে কি??
~হ্যা হাসান ভাইয়া।আপুনি আত্মহত্যা করেছে।আপুনি আত্মহত্যা করার আগে এই চিঠিটা আপনার জন্য লিখে গেছে বলেছে যদি কখনো আপনি ফিরে আসেন তাহলে এইটা দিতে
-কই??দাও আমাকে
~নিন
-আমি যাই ইরিন।পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও.
বলে হাসান চলে আসল। আর তারপর পার্কের সেই বেঞ্চটায় বসল।যেইটায় সে আর ইরা কতদিন বসেছে তার কোন হিসেব নেই।চিঠিটা খুলল সে…

“প্রিয়তম,
তুমি যখন চিঠিটা পড়বে তখন হয়তবা আর আমি বেঁচে নেই।চলে গেছি অনেক দূরে
এই হাসান একটু উপরে তাকাও তো
তাকিয়েছ??
আমাকে দেখতে পাচ্ছ??
তুমি এখনো গাধাই রয়ে গেলে।আরে গাধা ওই যে উপরে বামপাশে একটুকরো আকাশ ভাসছে।আমি এর উপর বসে আছি।
আমাদের বিয়ের তিনদিন থেকেই সেই যে তুমি গায়েব হলে তারপর তো আর কোন খোঁজ নিলে না
জানো,,,,,
আমি না তোমাকে অনেক খুঁজেছি।কত্তজায়গায় গিয়েছি বলতে পারব না।আমাদের ব্যাচের সবাইকে জিজ্ঞেস করেছি তোমার কথা।কিন্তু কেও ই খবর দিতে পারি নি
জানো হাসান,,,,,
আমি না মা হয়ে গিয়েছিলাম।আর এই কথা আব্বু জেনে গিয়েছিল।আব্বু আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে হাসান।আমার কেও নেই আজ।ইরিন ওর এক বান্ধবীর বাসায় কয়েকদিন রেখেছে।তারপর আমিই সেখান থেকে চলে আসছি
হাসান।তুমি যদি পাশে থাকতে তাহলে হয়তবা আজ আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হত না।কিন্তু তুমি যে নেই
কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলে হাসান?
খুব তো বলেছিলে জীবনে কখনই হাত ছাড়বে না।যত ঝড়ই আসুক।তাহলে এখন কেন ছেড়ে দিলে হাসান
তুমি কোথায় আছ হাসান??? আমাকে ভুলে গেছ হাসান??
যেখানেই থাকো ভাল থেকো
আমাকে ক্ষমা করে দিও।আমি তোমার সন্তান কে পৃথিবীর মুখ দেখাতে পারলাম না

ইতি
তোমার ইরা”

রিফাতের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল বেয়ে পড়ছে।
সে উপরে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“আমি হাত ছাড়ি নি ইরা।
আমাকে শুনতে পাচ্ছ ইরা?
আমি হাত ছাড়ি নি।আমার কথা তো জানোনা তুমি।জানলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে না,
ওইদিন তোমাকে বাসায় পৌছে দিয়ে ফেরার পথে রাস্তায় দেখলাম এক মহিলা পড়ে আছে।তার পেটে ছুরি ঢুকানো ছিল।আমি তাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম।
কিন্তু জানো ইরা ওই মহিলার জ্ঞান ফেরার পর পুলিশ যখন জিজ্ঞাসাবাদ করছিল তখন মহিলা টা আমাকে দেখিয়ে বলেছেন আমি নাকি উনার পেটে ছুরি ঢুকিয়েছি।বলেই মহিলাটা মারা গেল
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পুলিশ গ্রেফতার করে ফেলল
এত্তদিন জেলে থেকে পচছিলাম।গতকাল এক জন এসে সাক্ষী দেয় যে আসল ডাকাত কে খুঁজে পাওয়া গেছে।আর তারপর আজ আমার মুক্তি মিলল
বিশ্বাস কর আমি তোমাকে ধোঁকা দেই নি
তুমি তো আমার আত্মার অংশ।তোমাকে কিভাবে ধোঁকা দিব
আমাকে ক্ষমা করে দিও ইরা।আমি তোমার হাতটা ধরে রাখতে পারি নি,
রাফাত অনেকক্ষণ পার্কের বেঞ্চে বসে কাঁদছিল।কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হল টেরই পেল না
পরদিন সকালে অনেক লোকের ভীড় জমেছে পার্কে।সবাই খুব উৎসুক হয়ে একটা ছেলেকে দেখছিল
ছেলেটা শিশুর মত গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে আর পাশে কয়েকপাতা ঘুমের ওষুধের খোসা।ছেলেটা ঘুমাচ্ছে তবু নিঃশ্বাস ফেলছে না।আর ফেলবে ও না কোনদিন।

Facebook Comments