উইলিয়াম নকরেক

“তুমি কি চাও, সেটা তুমিই ভালো করে জানো”


উইলিয়াম নকরেক।।

একজন ছোটো ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম ছাত্র সংগঠন, সমাজকর্ম ও ছাত্র রাজনীতি নিয়ে। সে ছাত্র সংগঠন করতে চায়। সংগঠনের এর সদস্য হতে চাই। কিন্তু তার বন্ধুরা কেউ আগ্রহী না, তাই সেও আসতে চায় না। তবে তার ইচ্ছা আছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি চাও? সে বললো, ইচ্ছেও করে আবার বন্ধুরা ছাড়া একা একা কেমন জানি লাগে!

তাকে বললাম, আমিও যখন ছাত্র সংগঠনে এ যাত্রা শুরু করি, সে সময় আমিও আমার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে সাথে পাই নি। উল্টা তারা আমাকে সংগঠন না করার জন্য বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছে। বলেছে এসব করে কি হবে, শুধু শুধু সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই না। আমি কিছুই বলিনি। চুপচাপ সংগঠনে এ কাজ করেছি, নিয়মিত মিটিং করেছি, ষ্টাডি সেশনে যোগ দিয়েছি। সিনিয়র বড় ভাইয়েরা আমাকে বন্ধুরমত অনেক সহযোগিতা করেছে। তবে পরবর্তীতে অনেক বন্ধুরাই আমাকে সহযোগিতা করেছে। বিভিন্ন ধরণের সাহায্যে তারা এগিয়ে  এসেছে বিভিন্ন সময়ে।

সেই ছোট ভাইকে বলেছিলাম, জীবনের চলার পথে সব সময় সব বন্ধুকে সাথে পাবে না। অনেকের সাথেই তোমার মনের মিল হবে না বা যাবে না, তাদের মতাদর্শ বা মতবাদ তোমার সাথে মিলবে না। কিন্তু তারপরও সে তোমার বন্ধু। কেন বন্ধু তার কারণ কেউ জানে না? জানা নাই। বন্ধু অনেক ধরণেরই হয়। কেউ চায়ের দোকানের বন্ধু, কেউবা শুধুমাত্র ক্লাসের বন্ধু, কেউবা পাড়ার বন্ধু, কেউবা সহযোগিতা লাগবে তার জন্য বন্ধু, তবে কিছু বন্ধু সারা জীবনের জন্য। এরকম নানান ধরণের বন্ধুর কথা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্ত এমনও বন্ধু আছে যার বন্ধনটা একদম হৃদয়ে । আত্মার আত্মা। এমন বন্ধুর সংখ্যা খুব নগন্য। তবে জীবনে একজন ভালো বন্ধু পাওয়া খুবই কঠিন এবং ভাগ্যের ব্যাপার। যেমন এ বিষয়ে ব্রাদার রিপন জেমস গমেজ, সিএসসি লিখেছেন, “ মানুষের নিরন্তর পথ চলায় অক্সিজেনের কাজ করে বন্ধুত্ব। যে কথা কাউকে বলা যায় না, তার আগল অকপটে খুলে দেয়া যায় বন্ধুর সামনে। বন্ধু কখনো শিক্ষক, কখনো সকল দুষ্টুমির একমাত্র সঙ্গী। মনের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস, আবেগ আর ছেলেমানুষী হুল্লোড়ের অপর নামই তো বন্ধুত্ব। কখনও ছোটবেলার খেলার সঙ্গীরাই থেকে যায় আজীবন, কখনও জীবনের কোনও কঠিন মুহূর্তে নিজেকে চেনায় সে। পরিবারও যখন দূরে সরে যায়, নিজের উপর থেকে যখন বিশ্বাস চলে যায়, তখনও জীবনে ছায়ার মতো পাশে থাকে বন্ধু। জীবনের প্রতিটা বাঁকে বদলে যায় সে, কখনও নতুন নাম নিয়ে, কখনও নতুন চেহারায়, নতুন সংজ্ঞায় বদলে দিয়ে যায় জীবনের মানে। রাগ, দুঃখ, অভিমান, আনন্দ শুষে নিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে যে জীবন তার নামই বন্ধু।’

তিনি আরও লিখেছেন, নিজের পরিবার তুমি বেছে নিতে পার না, কিন্তু বন্ধু হল সেই পরিবার যা তুমি বেছে নিতে পার। জীবনের সবচেয়ে জরুরি উপাদান হল বন্ধুত্ব। বন্ধু সেই যে তোমার জীবনের সবটুকু জেনেও তোমাকে ভালবাসে! যদি তুমি পড়ে যাও, আমি তোমাকে টেনে তুলবোই! বন্ধু সেই যে তোমার হৃদয়ের সুরটা জানে। তুমি ভুলে গেলেও, সে তোমাকে ভুলতে দেবে না। বন্ধু পাশে থাকলেই ভাল সময় হয়ে ওঠে আরও সুন্দর, খারাপ সময় হয় সহজ। যখন তুমি নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেল, তখনও যে তোমার উপর বিশ্বাস রাখে, সেই হল বন্ধু।”

আমি তাকে বলেছিলাম জীবনে চলার পথে অনেক বন্ধুকেই তুমি তোমার সাথে পাবে না। অনেক বন্ধুর পথ তোমার একাকি চলতে হবে। রবি ঠাকুরের মত বলতে হবে, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে” । জীবন পথে সব সময় আমাদের একাই চলতে হবে। কেউ তোমার ভঙ্গুরপথের সঙ্গী হবে না কিন্তু সুখের দিনে এমন অনেক বন্ধুর দেখা পাবে। বড় কিছু হলে অনেকেরই মামা চাচা ভাই হবে কিন্তু দুঃসময়ের সময় কাউকে সাথে পাবে না। এটাই জীবন। তাই জীবনে চলার পথে তোমার মন যা বলবে তাই করবে। পথ চলতে চলতে তোমার মত এমন হাজারও পথিককে সাথে পাবে। যারা তোমার মতই একাকি যাত্রা শুরু করেছিল। একা একা পথ চলতে চলতে আজ তারা তাদের জীবন সংগ্রামে জয়ী সৈনিক।

একটা কথা মনে রাখবা, সবাই পথের সৃষ্টি করতে পারে না, কিছু মানুষকে পথ আবিস্কার করতে হয়। জঙ্গল পরিস্কার করে ভয়ংকর প্রাণী, জীব জন্তুর সাথে লড়াই করেই নতুন পথের সন্ধান দিতে হয়/প্রস্তুত করতে হয়। তুমি যখন নতুন পথের সন্ধান দিবে তখন আরো অনেক পথিক তোমাকে অনুসরণ করবে। তোমাকে সামনে রেখে পথ চলবে। আর এ জন্য তোমাকেই প্রথম পথ আবিস্কারের উদ্যোগটা নিতে হবে। কেননা নতুন পথের সন্ধান সবাই দিতে পারে না। এজন্য সৃষ্টিশীল পাগলের দরকার হয়। আর একমাত্র সৃষ্টিশীল পাগলামী তোমার মত তরুণদের মধ্যেই আছে। তোমার মত পাগলরাই নতুন পথের সন্ধান দিবে। কেননা লালন শাহ বলে গেছে “পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না” । আবার লালন শাহ এও বলে গেছে“ সময় গেলে সাধন হবে না”। তাই সময়ের কাজ সময়েই করতে হবে। কি করবে, কখন করবে, কেন করবে, কাদের জন্য করবে সেটা একান্তই তোমার ব্যাপার।

জীবনে এমন কিছু কঠিন মুর্হুত আসে তখন সিদ্ধান্ত নিতে অনেক ধকল সইতে হয়। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। জীবনে সিদ্ধান্ত নেয়াটা কঠিন একটা কাজ। নিজের সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। নিজের সম্বন্ধে না জানলে খুউব অল্প সময়েই হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। আত্মসচেতন হতে হবে।

মনের/ভেতরের কথাটা শোনা খুউব জরুরি। জীবন সম্পর্কে যার ধারণা ভালো সেই জীবনে ভালো করতে পারে। অনেকেই মনের/ভেতরের কথা শুনতে পারে না বলে ভুল করে। অনেকেই অন্যের ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে নিজের সত্ত্বাটাকেই মেরে ফেলে। জীবনে ক্যারিয়ার গঠনে নিজের মনের কথাগুলো শুনা দরকার।

এ বিষয়ে ব্রাদার রিপন জেমস গমেজ, সিএসসি বলেন,  “নিজের ভেতরের স্বরটির কথা শুনুন এবং সে অনুযায়ী কাজ করুন। এতে হয়তো অনেকে আপনাকে পাগলাটে ভাবতে পারে তবে অনেকে আবার আপনাকে একজন কিংবদন্তী গণ্য করবেন। নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিন। আপনার জীবন যেসব ঘটে সেসবে পূর্ণ দায়-দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিন। বাজে অভ্যাস কমিয়ে আনুন এবং আরো স্বাস্থ্যকর একটি জীবন-যাপনের চেষ্টা করুন। এমন কোনো খেলা খুঁজে বের করুন যেটি আপনাকে সুখী করে। আর সবচেয়ে বড় কথা কোনো কিছুতে গড়িমসি করবেন না। আপনি নিজে যেসব সিদ্ধান্ত  গ্রহণ করেন শুধু সেসব সিদ্ধান্তকেই আপনারা জীবনের আদলটাকে গড়ে তুলতে দিন। যেসব সিদ্ধান্ত আপনি গ্রহণ করেননি সেসব সিদ্ধান্তকে আপনার নিজের জীবনটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দিবেন না।”

তিনি বর্তমান সময়ের প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ্য করে বলেন, “আমরা যেখানে বাস করছি তা একটি সুন্দর খেলার মাঠ। যেখানে সবই সম্ভব। তথাপি আপনি এখানে চিরদিন থাকবেন না। আমাদের জীবনটা এই সুন্দর গ্রহে একটি ছোট আলোর ঝলকানির মতো। যা অবিশ্বাস্য গতিতে অজানা বিশ্বব্রহ্মান্ডের সীমাহীন অন্ধকারের দিকে উড়ে যাচ্ছে। সুতরাং এখানে নিজের সময়গুলো আবেগের সঙ্গে উপভোগ করুন। একে আরো উপভোগ্য করুন। একে গোনায় ধরুণ!”

জীবনে কিছু করতে হলে পাগলামীর দরকার আছে। এ পৃথিবীতে যারাই বড় হয়েছে বা স্মরণীয় হয়েছে তারা সবাই পাগল ছিলো। এমন পাগলের সংখ্যা দুনিয়াতে নেহাৎ কম নয়, যেমন আজকে আমরা যে বিদ্যুৎ বাতি ব্যবহার করছি যার ছোয়াই পৃথিবী আলোকিত সেই টমাস আলভা এডিসন পাগল না হলে আজ পৃথিবী বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত হতো না। কেননা হাজারবার ব্যর্থ হয়েও তিনি হাল ছাড়েননি। এর জন্যই তিনি আজও স্মরণীয়। আর এজন্যই তিনি বলতে পেরেছিলেন, আমি বলবনা ১০০০ বার হেরেছি,আমি বলব হারার ১০০০ টি কারন বের করেছি”। বিশ্বের সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনষ্টাইন তিনিও পাগল না হলে তাকে কেউই তাকে মনেই রাখত না। এমন হাজারও পাগল মানুষ আছে যারা নিজেদেও স্মরণীয় করতে পেরেছিলেন। যেমন বিল গেটস, পড়াশুনা ছেড়ে শেষ হওয়ার আগেই পড়াশুনার পাট চুকিয়েছিলেন, ষ্টিভ জবস, মার্ক জুকারবার্গ প্রমুখ। এজন্যই কিছু করতে হলে নিজের বিশ্বাস রাখতে হবে। অর্থাৎ আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য্য,  দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে।  তবে নিশ্চয়ই তোমার মন যা চায় তাই করবে। যেমনটা বঙ্গবন্ধু তার জীবনে করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাবার ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট টেনে বলেছিলেন, তার মা তার বাবাকে বলেছিলো ‘সামনে তোমার জনগণ অপেক্ষা করছে। পেছনে কিন্তু ইয়াহিয়া খানের বন্দুক। এই এত মানুষের ভাগ্য তোমার হাতে। কারও কথা শোনার দরকার নাই। তোমার নিজের মনে যে কথাটা আসবে, কারণ সারা জীবন তুমি সংগ্রাম করেছ এবং তুমি জানো কী চাও এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য কোনটা ভালো, তোমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। কাজেই তোমার মনে যে কথাটা আসবে, তুমি সেই কথা বলবা।’

নিজেকে আবিস্কার করতে হবে এবং নিজের মধ্যে যে সম্ভাবনা আছে সেটাকে খুঁজে বের করতে হবে। ভেতরের কথাটা মন দিয়ে শুনতে হবে। অর্থাৎ, ভেতরের মানুষটা কি চাই, সেটা তুমিই ভালো করে জানো।

নিজেকে আবিস্কার করতে না পারলে বুড়ো মানুষের মত আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না-

“যখন আমি ছোট ছিলাম তখন বিশ্বটাকে বদলে দেবার স্বপ্ন দেখতাম

আমি যখন কৈশোরে তখন দেশটাকে বদলবার স্বপ্ন দেখতাম,

যখন আমি যৌবনে তখন সমাজটাকে বদলে দেবার চিন্তা করতাম

আমি এখন বৃদ্ধ এখন আমি ভাবি, ইশ আমি যদি নিজেকেই বদলাতে পারতাম”

-সংগৃহীত

লেখক: উইলিয়াম নকরেক, ছাত্র সংগঠক

Facebook Comments