ঢাকা মেডিকেলের ৯৫ ভাগ রোগীই মৌসুমি কসাই!


কোরবানির পশু জবাইসহ কাটাকাটি করতে গিয়ে কারো হাত কেটেছে, পা কেটেছে, কারো আবার হাত-পা ভেঙেছে। অধিকাংশ রোগীই একদিনের মৌসুমি কসাই। এরা সবাই এসেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে।

ঈদের দিন সকাল থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলে আসা রোগীর শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি এসেছেন কোরবানির পশু কাটাকাটি করতে গিয়ে নিজেরা রক্তাক্ত হয়ে।

এদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই অবস্থায় দুর্ভোগে সময় কাটাতে হচ্ছে রোগীদের।

হাসপাতালের টিকেট কাউন্টার, নার্স এবং চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঈদের দিন সকাল ১০টার পর থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত পুরো হাসপাতালে রোগী এসেছে ১৬০ জন। যার মধ্যে ১৫৩ জন রোগী এসেছে কোরবানির পশু অর্থাৎ গরু বা ছাগল জবাইসহ কাটা-বাছা করতে গিয়ে হাত-পা কেটে অথবা ভেঙে।

জরুরি অস্ত্রোপচার কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, ২৪ জন রোগী অপেক্ষা করছে। যার মধ্যে ২৩ জনের হাত পা কাটা, বাকি একজন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার।

তাঁদের অনেকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁদের মধ্যে রাজধানীর দক্ষিণখান থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আবুল কাসেম (৪০) বলেন, ‘গরু কাটা প্রায় শেষ। কেজি খানিক বাকি আছে তখন। দা দিয়ে কোপ দিয়েছি একটি হাড়ে। হঠাৎ হাত থেকে দা সরে স্লিপ করেই পায়ের ওপর এসে পড়েছে। বেঁচে যে আছি সেটাই সৌভাগ্য। তবে খারাপ লাগছে না একদমই। আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজ করতে গিয়ে জখম হয়েছি, আল্লাহই সব ঠিক করে দেবেন।’

শনির আখড়া থেকে আসা রাশেদ (২৮) জানান, ‘গরুর মাংস কাটতে গিয়ে দুটো আঙুলই কেটে পড়ে গেছে। কখনো এসব করা হয় না বলে এমন ঝামেলা হয়েছে। তাই দেরি না করে দ্রুতই চলে এলাম হাসপাতালে।’

রাজধানীর শাহজাহানপুর থেকে আসা আবদুর রহিম (২২) বলেন, ‘সকালে যখন গরু জবাই করব, ঠিক তখনই গরুটা লাফ দিয়ে আমার শরীরের ওপর উঠেছে। সবাই যখন গরুর দড়ি ধরে টান দিল, তখন আবার গরু আমার বুকের ওপরই পড়ে গেছে। এ জন্য হাত এবং পা দুটোই ভেঙে গেছে।’

বনশ্রী থেকে আসা ইউনুস (২৫) বলেন, ‘হাত অনেকটা কেটে গেছে। ব্যান্ডেজ করে বসে আছি প্রায় তিন ঘণ্টা। শুধু সেলাইটা করে দিলেই বাড়ি যেতে পারতাম।  ডাক্তাররা সব ছুটিতে থাকায় অনেক রোগী এভাবেই বসে আছে। খুব যন্ত্রণা করছে হাতে। তবু বসে আছি।’

কর্তব্যরত একজন নার্স বলেন, প্রতিবার কোরবানির ঈদের দিনে এমন রোগী বেশি আসে। কিন্তু এবার যেন সব থেকে বেশি। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকার ফলে রোগীদের একটু ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

রোগীর ভোগান্তি নিয়ে জানতে চাইলে ক্যাজুয়াল সার্জারি বিভাগের ডা. লিমন চন্দ্র ধর বলেন, ‘আজ এভাবে ছাড়া কিছু তো করার নেই। সব মুসলিম ডাক্তাররা ছুটিতে আছেন। ক্যাজুয়াল সার্জারি বিভাগের তিনজন আর অর্থোপেডিক বিভাগ থেকে দুজন ডাক্তার এবং ছয়জন নার্স এখানে সেবা দিচ্ছেন। যাঁরা সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। অথচ সকাল ১০টার পর থেকে হাত-পা কাটা এবং ভাঙা রোগীর সংখ্যা বাড়তেই আছে। যার জন্য আরো ডাক্তার দরকার। কিন্তু আজ তো আর তা সম্ভব না।’

লিমন চন্দ্র ধর আরো বলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমার এখানে রোগী এসেছে ১৫৬ জন। যার মধ্যে ১৫৩ জন রোগীই কোরবানির কাজ করতে গিয়ে কেটেকুটে এখানে এসেছেন। দুজন সড়ক দুর্ঘটনায় আর একজন মোবাইলের সঙ্গে চার্জার কানেকটেড থাকায় বিস্ফোরণে আহত হয়ে এসেছেন।’

Facebook Comments