ঢাকার কোরবানির হাটে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই হতাশ


নিজস্ব প্রতিবেদক: ক্রেতাদের কাছে দাম মনে হচ্ছে বেশি; বিক্রেতারা বলছেন, দাম উঠছে না- ঈদের দুই দিন আগে রাজধানীর কোরবানির হাটে গিয়ে এই চিত্রই দেখা গেল।

বৃহস্পতিবার (৩১ আগস্ট) কোরবানির পশুর হাটগুলোকে জমজমাট দেখা গেলও বিক্রেতারা বলছেন, বিক্রি কম। ক্রেতাদের ভাষ্য, দাম কমার জন্য অন্তত আরেকদিন অপেক্ষা করতে চান তারা।

কমলাপুর হাটে কালো রঙের বড় ষাঁড় নিয়ে আসা টাঙ্গাইলের বাসাইলের সবুজ বেপারী সিন্ধি-শাহীওয়াল মিশ্র প্রজাতির সাড়ে তিন বছর বয়সী একটি গরুর দাম হাঁকছিলেন ১৫ লাখ টাকা।

তিনি বলেন, “কালু মাস্তানরে (গরুটির নাম) আমি পালছি। খুব ভালো ভালো খাবার খাওয়াইছি। ১৫ লাখ চাইছি আমি। লোকজন এখন পর্যন্ত ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত বলছে। আর কিছু বাড়লে হয়ত ছাইড়া দিমু।”

কমলাপুর স্টেডিয়াম, গোপীবাগ ও কমলাপুর মাঠ এবং শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘের মাঠের হাটে সকালে ক্রেতাদের ভিড় ছিল কিছুটা কম। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে।

কমলাপুর হাট থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকায় দুটি গরু কিনেছেন পরীবাগের বাসিন্দা এহসানুল করিম। তার মতে, এবার দাম গতবারের চেয়ে বেশি।

“গতবার এই গরু ৫০ হাজার টাকা করে কিনেছি। এইবার দাম একটু বেশিই নিল।”

কয়েকটি হাটে ঘুরলেও পশু কিনতে পারেননি বাসাবো কালীবাড়ি এলাকার ব্যবসায়ী শাহ আলম।

“কয়েকটা হাটে গেলাম। কিন্তু এখনও দাম ছাড়ছে না বেপারীরা। এখনও বোঝা যাচ্ছে না বাজার পরিস্থিতি। হয়ত শেষ মুহূর্তে গরু ছাড়বেন, বেপারীরা এই আশায় আছি।”

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে ১৪টি গরু নিয়ে এসেছেন মতিয়ার রহমান। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড়টি শাহীওয়াল জাতের ষাঁড়। মতিয়ার এর দাম হাঁকছেন ১২ লাখ টাকা। তবে এখনও গরুটি বিক্রি হয়নি। তার আনা ১২টি গরুর মধ্যে একটি বিক্রি হয়েছে।

মতিয়ার বলেন, গণমাধ্যমে ভারতীয় গরু প্রবেশের খবরে বাজারে বেচা-কেনা তেমন হচ্ছে না।

“পত্রিকা টেলিভিশন খুললেই দেখা যায় সাংবাদিকরা বলতেছে, ভারতের গরুর স্রোত বইছে। এইটা করে বাজার খারাপ করে দিতেছে। কারণ ক্রেতারা এখনও গরু কিনতেছে না। কিন্তু আপনি আমাকে দেখান এই হাটে কোনটা ভারতের গরু?”

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার জোড়পুকুর গ্রাম থেকে নিজের লালন পালন করা একটি ষাঁড় নিয়ে শাহজাহানপুর হাটে এসেছেন আহাদ আলী। তিনি এর দাম চাইছেন দেড় লাখ টাকা। কিন্তু এখনও ক্রেতা পাননি।

“লোকজন দাম করে ৮০ হাজার, ৯০ হাজার। এক লাখ ২০ হাজারের মতো কলি ছাড়ি দিতাম। দূর থাকি আসা, শনিবারের আগে বাড়ি যাবার চাই।”

অন্যদিকে গরু কিনতে শাহজাহানপুর হাটে আসা মানিকনগরের বাসিন্দা নূর হোসেন বলেন, “আজ পর্যন্ত কিনতে পারি নাই, ঘুরতেছি। যদি মনমতো পাই তাইলে আজ কিনব, নইলে আগামীকাল তো কিনতেই হবে।”

উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ১ম গোলচত্বর সংলগ্ন খালি জায়গায় করা কোরবানির পশুর হাটের ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ হাটে গরুর হাটে গরুর দাম এখনও আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি।

সকালে হাট থেকে গরু কিনে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন উত্তরার তিন নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম। তার কেনা গরুটির দাম ৮৫ হাজার টাকা।

জাহিদুল বলেন, “এই বছর গরুর দাম গতবারের চেয়ে বেশ কিছুটা বেশি। গতবার ঠিক এরকম গরুই কিনেছিলাম ৬২ হাজার টাকায়।”

উত্তরার চার নম্বর সেক্টরের ওবায়দুল হাসান এক লাখ ১৫ হাজার টাকায় গরু কিনে ভ্যানে তুলছিলেন। তিনিও জানান, এই বছর গরুর দাম বেশি।

ভারতীয় গরু আসা শুরু করলেও দুপুর পর্যন্ত উত্তরার এই হাটে গরুর দাম কমতে দেখা যায়নি।

গত বছরে যে আকারের ভারতীয় গরু ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এই বছরে তা ৫৫ থেকে ষাট হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাড্ডার আফতাবনগর হাটে বেচাকেনা এখনও পুরোদমে শুরু হয়নি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এ হাটে আসা জামালপুরের কালাম বেপারী বলছেন, বাজার আগের বারের চেয়ে ‘খারাপ’।

২২টি গরু এনে তিনটি বিক্রির পর কালাম বলেন, “দাম বেশি বলে না। এইবার নিয়া তিন বারের মতো খারাপ যাচ্ছে গরুর বাজার।”

গাইবান্ধার আতাউর রহমান ৩৬টি ছাগল আনলেও বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত তিনটি বিক্রি করতে পেরেছেন। তার ভাষ্য, “লোকজন দাম কয় না। যেইটা আশা করছি, এর চেয়ে কম কয়।”

কুষ্টিয়া থেকে গরু নিয়ে আসা বজলু ভারতীয় গরু নিয়ে শঙ্কার কথা জানান।

তিনি বলেন, “যদি ইন্ডিয়ান গরু ঢুকে তাহলে আমরা ধরা খাব। যদি বেচতে না পারি তাহলে আমরা গরু ফেরত নিয়া যাব। পরপর তিনবছর মাইর খাইছি। এই কাজ আর করব না।”

এদিকে দাম কমার আশায় থাকা নাখালপাড়ার বাসিন্দা বাকী বিল্লাহ বলেন, তারা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন।

“আমার জানামতে আমার আশপাশে ৩৫টার মতো গরু কেনা হয়। কিন্তু এখনও কেউ একটাও গরু কেনেনি।”

Facebook Comments