সিদ্দিকুর রহমান (ফাইল ছবি)

চলতি মাসেই চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন সিদ্দিকুর


সব ঠিক থাকলে চলতি মাসেই চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন পুলিশের টিয়ারশেলে দৃষ্টিশক্তি হারানো সরকারি তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস তাকে তার চাকরি দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিদ্দিকুরের বড় ভাই নায়েব আলী।

তিনি জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় সিদ্দিকুরের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ চলছে। এখন তাকে একটা চাকরি দেয়ার ব্যাপারেও নিশ্চিয়তা দেয়া হয়েছে। জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সিদ্দিকুরের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা তার বন্ধু রানা বলেন, এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানিতে সিদ্দিকুরকে চাকরি দেয়ার কথা বলেছে। কোম্পানির ডিরেক্টর এ বিষয়ে আমাদের জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় সিদ্দিকুরকে এ চাকরি দেয়া হচ্ছে। সেখানে খুব সম্ভবত টেলিফোন অপারেটর হিসেবে তাকে নিয়োগ দেয়া হবে। পরবর্তীতে সিদ্দিকুরের চোখের অবস্থার উন্নতি হলে ভিন্ন কোনো পোস্টে নিয়োগ দেয়া হতে পারে। যতদূর জানা গেছে, চলতি মাসের ১৪ তারিখ নিয়োগপত্র দেয়া হবে। এরমধ্যে যদি শারীরিকভাবে ভালো থাকে তাহলে সিদ্দিকুর শিগগিরই যোগ দিতে পারবে। তবে হাসপাতাল থেকে কবে ছাড়া পাচ্ছেন সিদ্দিকুর এখনো সে বিষয়ে চিকিৎসকরা কিছু জানাননি। আরো কিছুদিন হয়তো থাকা লাগবে।

এদিকে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই এবারের ঈদ কাটাতে হয়েছে পুলিশের টিয়ারশেলে দৃষ্টিশক্তি হারানো সিদ্দিকুরকে। ঈদের দিন হাসপাতালের মসজিদেই ঈদের নামাজ আদায় করেন তিনি। এরপর পুরোদিনটি  শুয়েবসে অলস সময় কাটিয়েছেন আর স্মৃতিচারণ করছেন তার জীবনের কেটে যাওয়া বিগত ঈদগুলোর। সিদ্দিকুরের বন্ধুরা- শেখ ফরিদ, শাহ আলী ঈদ করতে বাড়িতে গেছেন। কিন্তু যাওয়ার আগে সিদ্দিকুর ও তার মায়ের জন্য কেনাকাটা করে দিয়ে গেছেন। ঈদের দিন সকালে বন্ধুদের উপহার দেয়া পাঞ্জাবিই পরেছেন সিদ্দিকুর। তার মা ছোলেমা খাতুনও ছেলের বন্ধুদের দেয়া শাড়ি পরে তাদের করা বাজার দিয়ে রান্না করেছেন হাসপাতালেই। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আলাপকালে সিদ্দিকুর বলেন, প্রতি ঈদেই আমি গ্রামে যেতাম। আর কারো জন্য কিছু কিনতে না পারলেও ভাতিজা লাবিব ও দুই ভাতিজি নীলা ও শীলার জন্য নতুন জামা কিনে নিয়ে যেতাম। তারাও প্রতি ঈদেই আমার জন্য অপেক্ষা করতো। সিদ্দিকুর আরো বলেন, তাদের সব আবদার ছিল আমার কাছে। ওদের আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি। গত ঈদেও ওদের জন্য কেনাকাটা করে বাড়ি গিয়েছিলাম। কত খুশি হয়েছিল। গত ঈদেই আমার প্রিয় মুখগুলোকে শেষ দেখেছিলাম। ওই প্রিয়মুখগুলো আর দেখতে পারবো না সেটা ভাবলেই খুব কষ্ট হয়। ভাতিজা- ভাতিজিদের কাছেও সিদ্দিকুর অন্যরকম। তারাও ঈদের দিন গ্রামে থাকার কারণে প্রিয় চাচ্চুকে দেখতে পায়নি। সিদ্দিকুরের ভাই নায়েব আলী বলেন, ঈদের দিন শুধু চাচ্চু চাচ্চু করেই দিন কাটিয়েছে। তাই পরদিন কষ্ট হলেও ওদের নিয়ে এসেছি এখানে। মাকে আর দুটো বছর অপেক্ষা করতে বলেছিলেন সিদ্দিকুর। এরপরই পরিবারের হাল ধরবেন। কিন্তু ভাগ্য আর সহায় হয়নি এই শিক্ষার্থীর।

তিনি বলেন, মাকে বলেছিলাম আমাকে দুইটা বছর সময় দাও। আমি লেখাপড়া শেষ করে তোমাদের জন্য কিছু একটা করব। তিন বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান। অনেক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে সময় গেছে। আমার বড় ভাই মেট্রিক পাস করে পড়ালেখা ছেড়ে দেন। তিনি শ্রমিকের কাজ করে আমাকে লেখাপড়া করিয়েছেন। বড় ভাই সামান্য যে টাকা পান প্রথমে এসেই সেটা আমার হাতে দেন। বলেন, ‘ভাই তোর কতো টাকা লাগবো তুই রাখ। পরে আমি বাকিটা সংসারে খরচ করব।’ গত ঈদেও তিনি তার ছেলেমেয়ের জন্য একটা সুতাও কেনেননি। কিন্তু আমার জন্য একটা টি-শার্ট কিনেছেন। তিনি এতোটাই ভালোবাসেন আমাকে। ১৯৯৪ সালে মাত্র তিন বছর বয়সে সিদ্দিকুরের বাবা তহুর উদ্দিন মারা যান। এরপর বিধবা মা ছোলেমা খাতুন কিষাণির কাজ করে ছেলেদের লেখাপড়া করান। কিন্তু মাধ্যমিক পাস করার পর অভাবের সংসারের কথা ভেবে পড়ালেখা ছেড়ে দেন বড় ভাই নায়েব আলী। হাল ধরেন সংসারের। শ্রমিকের কাজ করে সংসারের পাশাপাশি সিদ্দিকুরের পড়ালেখার খরচ জোগাতে থাকেন। সিদ্দিকুর স্থানীয় পশ্চিম ঢাকেরকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৭ম শ্রেণি পাস করে ময়মনসিংহ শহরের কৃষ্টপুর আলিয়া মাদরাসা থেকে দাখিল ও আলিমে জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করেন। এরপর রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন ঢাকার তিতুমীর কলেজে। খিলক্ষেতে মেসে ভাড়া থাকার পাশাপাশি টিউশনি ও একটি দোকানে কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ যোগাতেন সিদ্দিকুর।

পরীক্ষার রুটিন ও তারিখ ঘোষণাসহ সাত দফা দাবিতে গত ২০শে জুলাই সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়া সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ তাদের ওই জায়গা ছেড়ে যেতে বললে তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুট ওভারব্রিজের পাশের অংশে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এ সময় সিদ্দিকুর রহমানের দু’চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে তাকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চেন্নাই পাঠানো হয়। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচার  হলেও চেন্নাই থেকে আলোহীন অবস্থাতেই ফিরতে হয়েছে সিদ্দিকুরকে।

Facebook Comments